বাবা হওয়ার পথে বাধা শুক্রাণুর অভাব! ১২০০ রোগীর ওপর গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য

সন্তানহীনতার জন্য আমাদের সমাজে সাধারণত মহিলাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলেও পুরুষদের শারীরিক সমস্যাও যে সমানভাবে দায়ী, তা অনেক সময়ই আড়ালে থেকে যায়। সম্প্রতি পূর্বভারত তথা পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ১,২০০ জন রোগীর ওপর চালানো এক বৃহৎ গবেষণায় পুরুষদের প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে অত্যন্ত উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। শহরের বিশিষ্ট গাইনোকোলজিস্ট ডা. সুজয় দাশগুপ্তের করা এই সমীক্ষায় দেখা গেছে, বহু পুরুষের বীর্যে শুক্রাণু নেই বা তাঁদের শরীরেই শুক্রাণু তৈরি হচ্ছে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই সমস্যার নাম ‘আজুস্পার্মিয়া’। গত চার বছরে দেশে এই সংক্রান্ত অন্যতম বৃহৎ এই গবেষণাপত্রটি ‘ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ পেরিন্যাটোলজি অ্যান্ড রিপ্রোডাকটিভ বায়োলজি’-তে প্রকাশিত হয়েছে।
কেন হারাচ্ছে প্রজনন ক্ষমতা
গবেষণায় দেখা গেছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শুক্রাণু তৈরি না হওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে আধুনিক জীবনযাত্রা এই সমস্যার অন্যতম বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। আইটি সেক্টরের কর্মী বা যাঁরা দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করেন, দীর্ঘ সময় বাইক বা গাড়ি চালান, তাঁদের অণ্ডকোষের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে গিয়ে শুক্রাণু উৎপাদনে মারাত্মক বাধা সৃষ্টি করে। এর পাশাপাশি অতিরিক্ত ওজন, ধূমপান এবং নিয়মিত ব্যায়ামের অভাব পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে। এছাড়াও জিমে শরীরচর্চার জন্য অ্যানাবলিক স্টেরয়েডের যথেচ্ছ ব্যবহার শুক্রাণু উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে। পাশাপাশি হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, জেনেটিক বা জিনগত ত্রুটি এবং মাম্পসের মতো ভাইরাসের সংক্রমণও পুরুষদের প্রজনন ক্ষমতা কমার পেছনে উল্লেখযোগ্য কারণ।
আধুনিক চিকিৎসায় পিতৃত্বের স্বপ্নপূরণ
পুরুষদের মধ্যে শুক্রাণু হ্রাসের এই প্রবণতা পারিবারিক জীবনে গভীর মানসিক প্রভাব ফেললেও, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান আশার আলো দেখাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বীর্যে শুক্রাণু না থাকা মানেই পিতৃত্বের পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। অনেক ক্ষেত্রেই অণ্ডকোষের ভেতরে থাকা অবশিষ্ট শুক্রাণু ‘টেসে’ (TESE) বা ‘মাইক্রো-টেসে’ পদ্ধতির মাধ্যমে সংগ্রহ করা সম্ভব। পরবর্তীতে আইভিএফ (IVF) ও ইক্সি (ICSI) প্রযুক্তির সাহায্যে সেই শুক্রাণু সরাসরি ডিম্বাণুতে প্রবেশ করিয়ে সফলভাবে নিষেক ঘটানো যায়। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত বহু পুরুষই সঠিক রোগনির্ণয়, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং এই আধুনিক প্রজনন প্রযুক্তির সাহায্যে সফলভাবে জৈবিক বাবা হতে পেরেছেন। তাই হতাশাগ্রস্ত না হয়ে সময়মতো সঠিক চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই এই সমস্যা থেকে মুক্তির প্রধান উপায়।