অমরত্বের খোঁজে পুতিন! বুড়ো হওয়া রুখতে ২৬ বিলিয়ন ডলারের মহাপ্রজেক্ট রাশিয়ায়

নিজস্ব প্রতিনিধি: সত্তরোর্ধ্ব বয়সেও খালি গায়ে ঘোড়সওয়ারি, কনকনে ঠান্ডায় বরফ জলে স্নান কিংবা আইস হকি খেলে নিজের এক চিরতরুণ ‘অজেয়’ ভাবমূর্তি দুনিয়ার সামনে তুলে ধরতে ভালোবাসেন রুশ রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন। কিন্তু এই বাহ্যিক ফিটনেসের আড়ালে কি লুকিয়ে রয়েছে আজীবন যুবরাজ হয়ে থাকার তীব্র বাসনা? মার্কিন সংবাদপত্র ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর একটি সাম্প্রতিক রিপোর্টে ঠিক এই চাঞ্চল্যকর দাবিই করা হয়েছে। শুধু ব্যক্তিগত ইচ্ছাই নয়, পুতিনের এই ‘অমরত্ব’ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এখন রাশিয়ার সরকারি নীতিতে পরিণত হয়েছে। বার্ধক্য রুখতে এবং মানুষের আয়ু বাড়াতে পুতিন প্রশাসন প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার (২ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি) খরচে শুরু করেছে এক বিশেষ সরকারি প্রকল্প, ‘নিউ হেলথ প্রিজারভেশন টেকনোলজিস’।
অঙ্গ প্রতিস্থাপন ও জিন থেরাপির মহাযজ্ঞ
২০২৪ সালে সরকারিভাবে লঞ্চ হওয়া এই মেগা প্রজেক্টের মূল লক্ষ্য হলো মানুষের বার্ধক্য প্রক্রিয়াকে ধীর করা এবং ভবিষ্যতে কৃত্রিমভাবে মানব অঙ্গ প্রতিস্থাপন করে জীবনকে দীর্ঘায়িত করা। এই মহাযজ্ঞে মূলত চারটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে— জিন থেরাপি (Gene Therapy), থ্রি-ডি বায়োপ্রিন্টিং (3D Bioprinting), জেনোট্রান্সপ্লান্টেশন (Xenotransplantation) এবং ক্রায়োথেরাপি (Cryotherapy)।
ইতিমধ্যেই রাশিয়ার উপ-বিজ্ঞান মন্ত্রী ডেনিস সেকিরিনস্কি দাবি করেছেন, জিন থেরাপির মাধ্যমে কোষের বয়স বাড়া রুখতে তাঁরা যে ওষুধ তৈরি করছেন, তা বার্ধক্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মানবজাতির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হতে চলেছে। অন্যদিকে, রুশ বিজ্ঞানীদের দাবি, তাঁরা ইতিমধ্যেই ইঁদুরের থাইরয়েড গ্রন্থি এবং মানুষের তরুণাস্থি সফলভাবে বায়োপ্রিন্ট করেছেন এবং লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিস্থাপনযোগ্য সম্পূর্ণ মানব অঙ্গ তৈরি করা।
পুতিনের অন্দরমহলেই লুকিয়ে অভিযানের মূল চাবিকাঠি
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, রাশিয়ার এই গোপন ‘অমরত্ব’ মিশনের রাশ রয়েছে পুতিনের নিজের অন্দরমহলেই। গোটা প্রকল্পের মূল কেন্দ্রে রয়েছেন পুতিনের সুযোগ্য কন্যা মারিয়া ভরোন্তসোভা, যিনি নিজে একজন প্রখ্যাত এন্ডোক্রিনোলজিস্ট এবং রাশিয়ার একাধিক জেনেটিক্স প্রোগ্রামের দেখভাল করেন। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন সোভিয়েত আমলের কুর্চাতভ ইনস্টিটিউটের প্রধান মিখাইল কোভালচুক।
কোভিডের সময় থেকেই পুতিন নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে অতিরিক্ত মাত্রায় সতর্ক। গত বছর বেজিংয়ে একটি সামরিক প্যারেড চলাকালীন পুতিন ও চিনা রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের মধ্যে দীর্ঘায়ু নিয়ে হওয়া একটি গোপন কথোপকথনে পুতিনকে বলতে শোনা গিয়েছিল, ‘মানুষ চাইলে অঙ্গ পরিবর্তন করে অমরত্ব লাভ করতে পারে।’ রাশিয়ার সাধারণ পুরুষদের গড় আয়ু যেখানে মাত্র ৬৮ বছর, সেখানে দেশের রাষ্ট্রপতির অমর হওয়ার এই জেদ এবং বিপুল বাজেট নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল নড়েচড়ে বসেছে।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান মহলের সংশয়
সিলিকন ভ্যালির ধনকুবের জেফ বেজোস বা স্যাম অল্টম্যানদের মতোই পুতিনও এখন অ্যান্টি-এজিং গবেষণায় রাশিয়াকে বিশ্বশক্তি বানাতে মরিয়া হলেও, আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান মহল কিন্তু এই দাবিগুলোকে খুব একটা পাত্তা দিচ্ছে না। সমালোচকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্ব বিজ্ঞান সমাজ থেকে রাশিয়া একঘরে হয়ে পড়ায় এই গবেষণার কোনো নিরপেক্ষ ‘পিয়ার-রিভিউ’ বা আন্তর্জাতিক জার্নালে পর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশিত হয়নি। ফলে রাজনৈতিক অনুদান ধরে রাখতে রুশ বিজ্ঞানীরা সাফল্যকে অতিরঞ্জিত করে দেখাচ্ছেন কি না, সেই সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।