বরুণ খুন মামলা: প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ, রাজনৈতিক তরজা তুঙ্গে

উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটার প্রতিবাদী শিক্ষক বরুণ বিশ্বাস হত্যা মামলায় এক নতুন ও চাঞ্চল্যকর মোড় এসেছে। ঘটনার ১৪ বছর পর এই হত্যাকাণ্ডে ‘ষড়যন্ত্রকারী’ হিসেবে নাম জড়াল রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। বুধবার নিহতের এক সহযোদ্ধা বনগাঁর পুলিশ সুপারের কাছে লিখিতভাবে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ দায়ের করেছেন। যদিও পুলিশ জানিয়েছে যে সমস্ত তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখে আইনানুগ পদক্ষেপ করা হবে। তবে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর নামে এই অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে সরাসরি মুখ খুলতে চাননি নিহত বরুণের পরিবারের সদস্যরা।
উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটার পাঁচপোতা গ্রামের বাসিন্দা বরুণ বিশ্বাস কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউশনের বাংলার শিক্ষক ছিলেন। এলাকার বিভিন্ন অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার হতেন তিনি। বাম জমানা থেকে শুরু করে রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পরেও গাইঘাটের সুটিয়ায় একের পর এক নৃশংস ধর্ষণের ঘটনার বিরুদ্ধে সামনে থেকে প্রতিবাদ গড়ে তুলেছিলেন তিনি। গঠন করেছিলেন ‘সুটিয়া প্রতিবাদী মঞ্চ’। এমনকি নদী সংস্কারের সরকারি টাকা নয়ছয় হওয়ার প্রতিবাদেও তৎকালীন শাসকদলের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন বরুণ। ২০১২ সালের ৫ জুলাই গোবরডাঙা স্টেশন থেকে ট্রেন থেকে নেমে বাড়ি ফেরার পথে দুষ্কৃতীদের গুলিতে নৃশংসভাবে খুন হন তিনি। হত্যাকাণ্ডের পরেই পরিবারের পক্ষ থেকে তৎকালীন মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও বরুণ বিশ্বাসের খুনের প্রকৃত বিচার মেলেনি।
সম্প্রতি রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিহত বরুণের দিদি প্রমীলা বিশ্বাস ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা নতুন করে ঘটনার তদন্তের দাবিতে তৎকালীন বিরোধী নেতা শুভেন্দু অধিকারীর দ্বারস্থ হন। তাঁর আশ্বাসের ভিত্তিতেই রাজ্য সরকারের সিআইডি তদন্ত শুরু করে এবং বনগাঁ আদালতে মামলার নতুন করে ট্রায়াল শুরু হয়। বিশেষ সরকারি আইনজীবীর দায়িত্ব গ্রহণের পর এক জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে এবং আগামী ৩১ অগস্ট নিহত বরুণের বাবার সাক্ষ্য দেওয়ার দিন নির্ধারিত রয়েছে। এই আবহেই বুধবার পেশায় শিক্ষক তথা বরুণের সহযোদ্ধা নন্দদুলাল দাস বনগাঁর পুলিশ সুপার বিদিশা কলিতা দাশগুপ্তর সঙ্গে দেখা করে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযোগকারী নন্দদুলাল দাসের দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের জন্যই বরুণ হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ও নিরপেক্ষ তদন্ত হয়নি। তাঁর এই অভিযোগকে এফআইআর হিসেবে গ্রহণ করে নতুন করে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করার দাবি জানিয়েছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘বরুণ খুনের দায় সিপিএমের উপরে চাপিয়ে দিয়ে মূল অভিযুক্তদের আড়াল করার চেষ্টা করেছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী।’ অন্যদিকে, এই প্রসঙ্গে নিহত বরুণের দিদি প্রমীলা বিশ্বাস জানান, “অভিযোগ করার অধিকার সকলেরই রয়েছে। নন্দদুলাল দাস তাঁর মতো করে আইনি পদক্ষেপ করেছেন। উনি যেটা অভিযোগ করেছেন, সেটা তদন্তসাপেক্ষ। এ নিয়ে আমাদের আলাদা করে কিছু বলার নেই।”
বনগাঁর পুলিশ সুপার বিদিশা কলিতা দাশগুপ্ত জানিয়েছেন, “অভিযোগ পেয়েছি। সেই অভিযোগে বিভিন্ন বিষয় রয়েছে। সমস্ত তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখে আইনানুগ পদক্ষেপ করা হবে।”
অন্যদিকে, কালীঘাট-তৃণমূলের পক্ষ থেকে এই অভিযোগের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বলেন, “গোটা পৃথিবী জানে, ওই ঘটনার সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দূরদূরান্তের কোনো সম্পর্ক নেই। ন্যায়বিচার যে কেউ চাইতেই পারেন। কিন্তু এই ভাবে অকারণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম জড়িয়ে দেওয়ায় ন্যায়বিচারের দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্য, সে প্রশ্ন উঠেই যায়। কারণ, এর নেপথ্যে যে গভীর রাজনৈতিক অভিসন্ধি ও চক্রান্ত রয়েছে, তা এখন অত্যন্ত স্পষ্ট।”